
ফাহমিদা বেগমের বাসায় আলাদা কোনো ট্যাবলেট, ল্যাপটপ বা স্মার্ট টিভি নেই। বাচ্চাদের পড়াশোনা বা কার্টুন সবকিছুই চলে একটা কম দামের অ্যান্ড্রয়েড ফোনে। গার্মেন্টস থেকে ফিরতে দেরি হলে অনেক সময় ছোট ছেলেটাকে শান্ত রাখতে ফোনই ভরসা হয়ে যায়। একদিন তিনি খেয়াল করলেন, তিন বছরের ছেলে ইউটিউব খুলে নিজেই কার্টুন চালাতে শিখে গেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, সে এখন খাওয়ার সময়, ঘুমানোর আগে, এমনকি মাঝরাতেও মোবাইল চাইছে। এটা দেখে ফাহমিদার মনে প্রশ্ন আসে, “মোবাইল কি পুরোপুরি খারাপ? নাকি ঠিকভাবে ব্যবহার করলে শেখার কাজেও লাগতে পারে?”
এক্ষেত্রে বিজ্ঞান বলছে, মোবাইল নিজে ভালো বা খারাপ না। আসল বিষয় হলো, কী কন্টেন্ট দেখা হচ্ছে, কতক্ষণ দেখা হচ্ছে এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। শিশুর মস্তিষ্ক ছোট বয়সে খুব দ্রুত বিকশিত হয়। তাই এই সময়ে ইন্টারেক্টিভ লার্নিং, ভাষার সঙ্গে পরিচিতি, বিভিন্ন শব্দ ও ছবি এগুলো শেখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একইসাথে অতিরিক্ত সময় স্ক্রিনের সামনে থাকলে শিশুর মনোযোগ, ঘুম, ভাষার বিকাশ এমনকি আবেগ নিয়ন্ত্রণের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, “স্ক্রিন একটি মাধ্যম, শিশুকে সামলানোর বিকল্প নয়।”
অর্থাৎ শুধু শিশুকে চুপ করিয়ে রাখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা এলোমেলো ভিডিও চালিয়ে দেওয়া শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কিন্তু যদি মোবাইল সঠিক দিকনির্দেশনা ও শেখার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তাহলে কিছু ইতিবাচক উপকার পাওয়া সম্ভব।
ফাহমিদার বড় দুই মেয়ের পড়াশোনার সময় তিনি পরে কিছু ছোট পরিবর্তন আনেন।
আগে বাচ্চারা শুধু একটানা কার্টুন দেখত। এখন তিনি চেষ্টা করেন শেখার মতো বিষয়ভিত্তিক কনটেন্ট বেছে দিতে। যেমন—
• বাংলা ছড়া
• বর্ণ শেখা
• সংখ্যা শেখা
• প্রাণীর ডাক চেনা
• সহজ বিজ্ঞানভিত্তিক অ্যানিমেশন
• গল্প শোনা
বিশেষ করে ৩–৮ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ছবি ও শব্দভিত্তিক শেখা অনেক কার্যকর হতে পারে। কারণ এই বয়সে শিশুরা ছবি, শব্দ এবং বারবার দেখানো বা শোনানোর মাধ্যমে দ্রুত শেখে।
তবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, “একসাথে দেখা (co-viewing)”
শিশুর বিকাশ নিয়ে গবেষণা অনুযায়ী, শিশু একা স্ক্রিন দেখার চেয়ে মা-বাবার সাথে মিলে দেখলে বেশি শেখে। কারণ তখন সে শুধু ভিডিও দেখে না, পাশাপাশি Language interaction ওপায়।
যেমন, ফাহমিদা এখন মাঝে মাঝে ছেলেকে নিয়ে প্রাণীর ভিডিও দেখেন এবং জিজ্ঞেস করেন,
“এটা কোন প্রাণী?”
“গরু কী শব্দ করে?”
“কয়টা আপেল আছে?”
এই ছোট ছোট কথোপকথনগুলোই আসলে শিশুর শেখাকে আরও শক্তিশালী করে।
আরেকটি বড় ভুল অনেক পরিবারে হয়, শিক্ষামূলক ভিডিও মানেই সীমাহীন স্ক্রিন টাইম দেওয়া। আসলে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত উদ্দীপিত করতে পারে। বিশেষ করে দ্রুত পরিবর্তনশীল ভিডিও, খুব বেশি উজ্জ্বল রং বা একটানা অটোপ্লে শিশুর মনোযোগের সময় কমিয়ে দিতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং American Academy of Pediatrics বলছে—
• ২ বছরের নিচে শিশুদের স্ক্রিন এড়িয়ে চলা ভালো (ভিডিও কল ছাড়া)
• ২–৫ বছর বয়সে সীমিত ও অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে স্ক্রিন ব্যবহার ভালো
• স্ক্রিনের চেয়ে বাস্তব জীবনভিত্তিক খেলা, কথা বলা এবং নড়াচড়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ
ফাহমিদার ছোট ছেলেটা আগে মোবাইল ছাড়া খেত না। পরে তিনি পুরোপুরি বন্ধ না করে একটা নিয়ম করেন যে খাওয়ার সময় “NO MOBILE”।
শুরুতে অনেক কান্না করেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে শিশুটি অভ্যস্ত হয়ে যায়।
এখন তারা মোবাইলকে ‘শেখার সময়’ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেন, সারাদিন মনোযোগ বিচ্যুতির মাধ্যম হিসেবে নয়।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কম আয়ের পরিবারের জন্য মোবাইল অনেক সময় শিক্ষার একমাত্র সহজলভ্য মাধ্যম হতে পারে। তাই বাবা-মাদের Guilt feel করার দরকার নেই। বরং সীমিত রিসোর্স দিয়েও স্মার্টভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।যেমন—
যেমন—
প্রতিদিন ২০–৩০ মিনিট নির্দেশনাভিত্তিক শিক্ষামূলক কনটেন্ট
ভিডিও দেখে পরে বাস্তবে অনুশীলন করা
ছড়া শুনে একসাথে বলা
সংখ্যা শেখার ভিডিও দেখে বাসার জিনিস গোনা
আঁকা শেখার ভিডিও দেখে আঁকাআঁকি করা
এগুলো শিশুর ভাষা, স্মৃতি, সৃজনশীলতা এবং প্রাথমিক শেখার দক্ষতা বিকাশে সাহায্য করতে পারে।
তবে একটা বিষয় সবসময় মনে রাখা জরুরি, শিশুর সবচেয়ে বড় শেখা এখনো মানুষের কাছ থেকেই আসে, স্ক্রিন থেকে নয়।
মায়ের মুখের গল্প, বড় বোনের সাথে খেলা, বাস্তব জীবনের কথা বলা, বাইরে দৌড়ানো এগুলোই মস্তিষ্ক বিকাশের মূল ভিত্তি।
মোবাইল শেখায় সাহায্য করতে পারে, কিন্তু শিশুর আবেগগত সংযোগ এবং বাস্তব জীবনের বিকল্প হতে পারে না।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন