লোগো

শিশুর শিক্ষায় বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

শিশুর শিক্ষায় বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আমি ছোটবেলায় একটা জিনিস খুব বেশি দেখেছি, পরিবারের পড়াশোনার দায়িত্ব সাধারণত মায়ের ওপরই বেশি থাকত। বাবা সংসারের খরচ চালাতেন, আর মা দেখতেন স্কুল, হোমওয়ার্ক, খাতা আর পরীক্ষার বিষয়গুলো। এখন নিজে বাবা হওয়ার পর বুঝছি, এই ধারণাটা এখনো অনেক পরিবারে আছে।

আমিও শুরুতে ভাবতাম, যেহেতু সারাদিন অফিসে থাকি, তাই বাচ্চার পড়াশোনার বিষয়টা মূলত ওর মা-ই দেখবেন। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম, বাবার অংশগ্রহণ শুধু “পড়ানো”র মধ্যে সীমাবদ্ধ না। এটা শিশুর আত্মবিশ্বাস, শেখার আগ্রহ এবং বাবা-সন্তানের সম্পর্কের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
আমার চার বছরের ছেলে এখন অক্ষর, সংখ্যা আর ছোট ছোট ছড়া শিখছে। আমি যখন রাতে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরি, তখন অনেক সময় শক্তি থাকে না। তারপরও যেদিন ওর পাশে বসে ১০–১৫ মিনিট কিছু দেখি, শুনি বা কথা বলি, সেদিন ওর আনন্দটা আলাদা থাকে।
একদিন তো শুধু আমাকে দেখানোর জন্যই সে বারবার সংখ্যা গুনে শোনাচ্ছিল। তখন বুঝলাম, শিশুর কাছে “বাবা আমার দিকে মন দিচ্ছে”, এই অনুভূতিটা অনেক বড় ব্যাপার।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর শেখার প্রক্রিয়ায় বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণ তার পড়াশোনা, ভাষা দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাসের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন বাবা শিশুর শেখার যাত্রায় অংশ নেন, তখন শিশুরা সাধারণত,
• পড়াশোনার প্রতি বেশি আগ্রহ দেখায়
• নিজের ওপর বেশি বিশ্বাস পায়
• স্কুলে যাওয়ার জন্য ভালোভাবে প্রস্তুত হয়
• সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলে
আমি আগে ভাবতাম, অংশগ্রহণ মানেই হয়তো বসে বসে পড়ানো। কিন্তু এখন বুঝেছি, শেখার সুযোগ অনেক সাধারণ মুহূর্তের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।
যেমন—
• গল্প শোনা
• ছবির বই দেখে কথা বলা
• নতুন শব্দ শেখানো
• একসাথে সংখ্যা গোনা
• বাইরে কিছু দেখিয়ে বোঝানো
• অনলাইন ওয়ার্কশিট নিয়ে ছোট ছোট অনুশীলন করা
এসবও শেখারই অংশ।
আমার ছেলে এখন গাড়ি খুব পছন্দ করে। তাই অনেক সময় রাস্তায় চলতে চলতে গাড়ি গুনে সংখ্যা শেখাই। কখনো ট্রাফিক সিগন্যাল দেখে রঙ চিনতে শেখাই। আবার কখনো প্রাণী নিয়ে ভিডিও দেখার পরে ওয়ার্কশিটে প্রাণীর ছবি মিলিয়ে দেখতে বলি। এতে শেখাটা ওর কাছে পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলার মতো মনে হয়।
শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ছোট শিশুদের শেখা যদি খেলা ও পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে হয়, তাহলে সেটা বেশি কার্যকর হয়।
আরেকটা বিষয় আমি বুঝেছি, বাবা শেখার প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকলে শিশুর মধ্যে মানসিক নিরাপত্তার অনুভূতিও বাড়ে। আমাদের সমাজে এখনো অনেক পরিবারে বাবা মানেই একটু দূরের মানুষ। “বাবা ব্যস্ত”, “বাবা ক্লান্ত”, এমন একটা ধারণা শিশুর মনে তৈরি হয়ে যায়।
আমি নিজেও জানি, চাকরি আর সংসারের দায়িত্বের কারণে সবসময় সময় বের করা সহজ নয়। কিন্তু ছোট ছোট মুহূর্তও অনেক বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
যখন আমি ছেলের আঁকা ছবি দেখি, নতুন শেখা ছড়া শুনি বা ওর করা ওয়ার্কশিটের প্রশংসা করি, তখন ও বুঝতে পারে
“বাবা আমার ব্যাপারে আগ্রহী।”
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, বাবা-মায়ের ইতিবাচক মনোযোগ শিশুদের ভেতরের শেখার আগ্রহকে আরও শক্তিশালী করে। তখন তারা শুধু বকা এড়ানোর জন্য শেখে না, বরং নিজের কৌতূহল থেকেই শিখতে চায়।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কথোপকথন। বাবা ও সন্তানের নিয়মিত কথাবার্তা শিশুর ভাষা দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। আমি নিজেও খেয়াল করি, আমি যখন গল্প করি বা প্রশ্ন করি, তখন ছেলে আরও নতুন নতুন প্রশ্ন করতে শুরু করে। এভাবেই কৌতূহল তৈরি হয়।
তবে একটা বিষয় আমি এখন খুব গুরুত্ব দিয়ে বুঝি, অংশগ্রহণ মানে চাপ তৈরি করা না। অনেক বাবা অজান্তেই শেখার বিষয়টাকে কঠিন করে ফেলেন।
যেমন—
• অন্য শিশুদের সঙ্গে তুলনা করা
• ভুল করলে রাগ করা
• শুধু ফলাফলের দিকে নজর দেওয়া
এসব শিশুর মধ্যে শেখা নিয়ে ভয় বা উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
আমি এখন চেষ্টা করি শেখাটাকে স্বাভাবিক আর আনন্দময় রাখতে। কারণ এই বয়সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কৌতূহল, আত্মবিশ্বাস আর শেখার প্রতি ভালোবাসা তৈরি হওয়া।
যৌথ পরিবারে একটা বাড়তি সুবিধাও আছে। আমার বাবা মাঝে মাঝে নাতিকে পুরোনো গল্প বলেন, বাংলা ছড়া শেখান বা ছোটবেলার অভিজ্ঞতা শোনান। এতে শেখাটা শুধু বই বা স্ক্রিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। 
তবে কাজের ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত সময় বের করা এখনো চ্যালেঞ্জ। অনেক দিন বাসায় ফিরতে ফিরতে দেরি হয়ে যায়। তখন খারাপও লাগে। কিন্তু পরে বুঝেছি, প্রতিদিন অনেক সময় দেওয়ার চেয়ে নিয়মিত অল্প সময় মন দিয়ে পাশে থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরাও বলেন, সময়ের পরিমাণের চেয়ে সময়ের মান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমি এখন বুঝি, শিশুর পড়াশোনায় যুক্ত থাকা মানে শুধু তাকে ভালো ছাত্র বানানো না। এটা তাকে অনুভব করানো যে, তার শেখা, তার প্রশ্ন আর তার ছোট ছোট অর্জনগুলো আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
আমার ছেলে হয়তো একদিন ভুলে যাবে কোন বয়সে কোন অক্ষর শিখেছিল। কিন্তু হয়তো মনে রাখবে, ছোটবেলায় বাবা তার পাশে বসে বই দেখত, গল্প শুনত, আর তার শেখা নতুন জিনিস শুনে সত্যিই খুশি হতো। আর অনেক সময় এই অনুভূতিটাই একটি শিশুর শেখার আগ্রহকে সবচেয়ে বেশি শক্তি দেয়।

 

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000