
আজকাল বাচ্চাদের জন্য শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট আর অ্যাপের সংখ্যা এত বেশি যে অনেক সময় মা-বাবারাই বিভ্রান্ত হয়ে যান। কোনটা সত্যিই শেখার জন্য ভালো, আর কোনটা শুধু রঙিন অ্যানিমেশন আর বিজ্ঞাপন দিয়ে শিশুকে পর্দার সামনে আটকে রাখছে; সেটা বোঝা সহজ নয়। আমি নিজেও প্রথমদিকে এই ভুল করেছি। সুন্দর নকশা আর “শিক্ষামূলক অ্যাপ” লেখা দেখেই অনেক কিছু ডাউনলোড করতাম। কিন্তু পরে বুঝলাম, সব শিক্ষামূলক বিষয়বস্তু আসলে শিক্ষামূলক নয়।
একজন মা হিসেবে এখন আমি কিছু বিষয় খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখি।
প্রথমত, অ্যাপ বা ওয়েবসাইট শিশুকে শুধু তাকিয়ে থাকতে বলছে, নাকি তাকে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে উৎসাহ দিচ্ছে, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভালো শিক্ষামূলক বিষয়বস্তু শিশুকে ভাবতে, উত্তর দিতে, কিছু খুঁজে বের করতে বা সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে। যেমনঃ
• অক্ষর চেনা
• সংখ্যা শেখা
• ধাঁধা সমাধান
• মিল খুঁজে বের করা
• ছোট ছোট সমস্যা সমাধান করা
শুধু ভিডিও চালিয়ে শিশুকে চুপ করিয়ে রাখার মতো বিষয়বস্তু দীর্ঘমেয়াদে খুব একটা উপকারী নয়।
দ্বিতীয়ত, বিষয়বস্তু শিশুর বয়সের সঙ্গে মানানসই কি না, সেটাও দেখা জরুরি।
অনেক অ্যাপ ছোট শিশুদের জন্য তৈরি হলেও সেখানে খুব দ্রুত দৃশ্য পরিবর্তন, অতিরিক্ত শব্দ বা জটিল নির্দেশনা থাকে। এগুলো অনেক সময় শিশুর মনোযোগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট শিশুদের জন্য শান্ত, সহজ এবং ধীরগতির বিষয়বস্তু বেশি উপকারী।
তৃতীয়ত, বিজ্ঞাপন বা অপ্রয়োজনীয় লিংক আছে কি না, সেটা খেয়াল করা খুব জরুরি।
অনেক বিনামূল্যের অ্যাপে বারবার বিজ্ঞাপন আসে বা অন্য ভিডিও খুলে যায়। এতে শিশুর মনোযোগ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অনুপযুক্ত বিষয়বস্তুর সামনে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
আমি এখন চেষ্টা করি বিজ্ঞাপনমুক্ত বা অভিভাবক-নিয়ন্ত্রিত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে।
আরেকটা বিষয় আমি খুব গুরুত্ব দিই, “ভাষার মান”।
যে অ্যাপ বা ওয়েবসাইট শিশুকে ভুল উচ্চারণ, অস্পষ্ট ভাষা বা খুব দ্রুত কথা বলা শেখায়, সেগুলো আমি এড়িয়ে চলি। কারণ ছোট শিশুরা খুব দ্রুত অনুকরণ করে শেখে।
বিশেষ করে বাংলা শেখার বয়সে আমি খেয়াল রাখি, যেন বিষয়বস্তুতে পরিষ্কার উচ্চারণ এবং সহজ ভাষা থাকে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পর্দার বাইরে শেখার সুযোগ আছে কি না।
ভালো শিক্ষামূলক অ্যাপ শুধু পর্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং শিশুকে বাস্তব কিছু করতে উৎসাহ দেয়। যেমন,
• রং করা
• গল্প বলা
• গুনে দেখা
• ঘরের জিনিসপত্র চেনা
এতে ডিজিটাল শেখা আর বাস্তব জীবনের শেখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হয়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন বিষয়বস্তু বেশি পছন্দ করি, যেখানে সৃজনশীল হওয়ার সুযোগ থাকে। কারণ শুধু সঠিক উত্তর চাপ দেওয়া আর সত্যিকারের শেখা এক বিষয় নয়।
যেমন ছবি আঁকা, গল্প তৈরি করা, কিছু গড়ে তোলার খেলা বা কল্পনাভিত্তিক কার্যক্রম শিশুর চিন্তাশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
আরেকটা বিষয় অনেক মা-বাবা খেয়াল করেন না, অ্যাপটি কি শিশুকে শান্ত রাখছে, নাকি অতিরিক্ত উত্তেজিত করে তুলছে?
আমি নিজের মেয়ের মধ্যে দেখেছি, কিছু দ্রুতগতির বিষয়বস্তু দেখার পর ও সহজেই বিরক্ত বা অস্থির হয়ে যায়। আবার কিছু শান্ত শিক্ষামূলক কার্যক্রম করার পর অনেক বেশি মনোযোগী থাকে।
তাই এখন আমি স্ক্রিন ব্যবহারের পর ওর আচরণ পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করি।
সবশেষে আমি যেটাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, কোনো অ্যাপ বা ওয়েবসাইট কখনোই মা-বাবার বিকল্প হতে পারে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট শিশুরা সবচেয়ে ভালো শেখে পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে। তাই শুধু ডিভাইস হাতে দিয়ে দিলেই শেখা সম্পূর্ণ হয় না।
আমি এখন চেষ্টা করি মেয়ের পাশে বসে মাঝে মাঝে ও কী শিখছে তা দেখার। ও কোনো নতুন শব্দ শিখলে সেটা নিয়ে কথা বলি, কোনো গল্প দেখলে পরে সেটা নিয়ে আলোচনা করি।
কারণ প্রযুক্তি নিজে খারাপ নয়। কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনা ছাড়া সেটা খুব সহজেই শুধু সময় কাটানোর মাধ্যম হয়ে যেতে পারে। যা বাচ্চাদের জন্য ক্ষতিকর।
তাই শিক্ষামূলক অ্যাপ বা ওয়েবসাইট বেছে নেওয়ার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এটা কি সত্যিই শিশুর কৌতূহল, চিন্তাশক্তি এবং শেখার আগ্রহ বাড়াচ্ছে, নাকি শুধু তাকে ব্যস্ত রাখছে?
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন