লোগো

শিশুর জন্য নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস কীভাবে গড়ে তুলবেন?

শিশুর জন্য নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস কীভাবে গড়ে তুলবেন?

যমজ সন্তান হওয়ার পর আমি আর আমার স্ত্রী খুব দ্রুত একটা জিনিস বুঝে গিয়েছিলাম, শিশুকে বড় করার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ঘুম। রাতের পর রাত এমন গেছে, যখন একজন ঘুমালেই আরেকজন জেগে উঠত। একজনকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াতে না পাড়াতেই অন্যজন কান্না শুরু করত। অনেক সময় মনে হতো, আমরা যেন পালা করে শুধু বাচ্চা সামলাচ্ছি, ঘুমানোর সুযোগই পাচ্ছি না।

এদিকে বাসার সবাইও নানা ধরনের পরামর্শ দিত। কেউ বলত, “দিনে বেশি খেলাও, রাতে ঘুমাবে।” কেউ বলত, “কোলে বেশি নিলে অভ্যাস হয়ে যাবে।” আবার কেউ বলত, “দিনে জাগিয়ে রাখো, তাহলে রাতে ঘুম ভালো হবে।”
শুরুতে আমরা এসব পরামর্শের অনেক কিছুই চেষ্টা করেছি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বুঝলাম, সব পরামর্শ সব শিশুর জন্য কাজ করে না। বরং একটার পর একটা নতুন কিছু চেষ্টা করতে গিয়ে আমরা নিজেরাই আরও বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছিলাম।
পরে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে কিছু বিষয় অনুসরণ করা শুরু করি। তখনই বুঝলাম, ছোট শিশুদের ঘুম নিয়ে আমাদের অনেক ভুল ধারণা ছিল।
প্রথমেই যেটা জানা জরুরি, সেটা হলো, নবজাতক বা ছোট শিশুর ঘুম বড়দের মতো হয় না। জীবনের প্রথম কয়েক মাসে তাদের শরীরের দিন-রাতের ছন্দ পুরোপুরি তৈরি হয় না। তাই কখন ঘুমাবে, কখন জাগবে, সেটা অনেকটাই অনিয়মিত হওয়া স্বাভাবিক।
একসময় আমি ভাবতাম, বাচ্চা ক্লান্ত হলে নিজে থেকেই ঘুমিয়ে পড়বে। পরে বুঝেছি, বিষয়টা সবসময় এমন না। অনেক শিশু অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে গেলে বরং আরও অস্থির হয়ে যায় এবং ঘুমাতে বেশি কষ্ট হয়।
তাই এখন আমরা ঘুমের লক্ষণগুলো খেয়াল করার চেষ্টা করি। যেমন বারবার হাই তোলা, চোখে হাত দেওয়া, হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যাওয়া বা একটু বেশি বিরক্ত হয়ে পড়া। এসব দেখলেই আমরা ওদের ঘুমের প্রস্তুতি শুরু করি।
আমাদের আরেকটা বড় সাহায্য করেছে একটা সহজ ঘুমানোর আগের রুটিন বা bedtime routine।
প্রতিদিন ঘুমের আগে প্রায় একই কাজগুলো করার চেষ্টা করি, ডায়াপার বদলানো, খাওয়ানো, আলো একটু কমিয়ে দেওয়া, শান্তভাবে কথা বলা। এতে ধীরে ধীরে শিশুরা বুঝতে শুরু করে যে এখন বিশ্রামের সময়।
রুটিনটা খুব সাধারণ হলেও নিয়মিত একইভাবে করার ফলে একটা পরিচিত পরিবেশ তৈরি হয়, যা অনেক শিশুর জন্য স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
আরেকটা বিষয় আমরা পরে শিখেছি, দিনে আর রাতে একটু আলাদা পরিবেশ তৈরি করা।
দিনে জানালার আলো, খেলাধুলা আর কথাবার্তা বেশি থাকে। আর রাতে যতটা সম্ভব শান্ত পরিবেশ রাখার চেষ্টা করি। এতে ধীরে ধীরে শিশুর শরীর দিন-রাতের পার্থক্য বুঝতে শিখতে পারে।
যৌথ পরিবারে অবশ্য এটা সবসময় সহজ ছিল না। পরিবারের সবাই বাচ্চাদের খুব আদর করত। ঘুমের সময়েও কেউ কোলে নিতে চাইত, কেউ খেলাতে চাইত। প্রথমদিকে কাউকে কিছু বলতে অস্বস্তি লাগত। পরে আমরা শান্তভাবে বোঝানোর চেষ্টা করি যে অতিরিক্ত উত্তেজনা বা অনেক বেশি ইন্টারঅ্যাকশন (interaction) অনেক সময় শিশুদের ঘুমাতে অসুবিধা করতে পারে। ধীরে ধীরে সবাই বিষয়টা বুঝতে শুরু করেন।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপদ ঘুমের পরিবেশ।
শিশুর জন্য সমতল ও শক্ত বিছানায় চিৎ হয়ে ঘুমানো সবচেয়ে নিরাপদ বলে বর্তমান চিকিৎসা নির্দেশিকাগুলোতে বলা হয়। অতিরিক্ত বালিশ, নরম খেলনা বা ভারী কম্বল এড়িয়ে চলার পরামর্শও দেওয়া হয়।
তবে একটা বিষয় আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছি, শিশুর ঘুমের রুটিন তৈরি করা কোনো প্রতিযোগিতা না।
কিছু দিন সবকিছু পরিকল্পনামতো হবে, আবার কিছু দিন একেবারেই হবে না। কোনো কোনো রাতে সব চেষ্টা ব্যর্থ মনে হবে। সেটাও স্বাভাবিক।
আজও আমাদের বাসায় মাঝেমধ্যে এমন রাত আসে, যখন দুজনের একজন না একজন ঘুমের নিয়ম ভেঙে দেয়। কিন্তু আগের মতো আর অসহায় লাগে না। কারণ এখন অন্তত বুঝি, শিশুর ঘুম কোনো "ভালো অভ্যাস" বা "খারাপ অভ্যাস" দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
এটা তাদের বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক একটি অংশ। তাই ধৈর্য, কনসিস্টেন্সি আর একটু বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা, এই তিনটিই বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় সহায়।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000