লোগো

বকাঝকা নয়, কৌশলে কমান শিশুর কার্টুন দেখার অভ্যাস

বকাঝকা নয়, কৌশলে কমান শিশুর কার্টুন দেখার অভ্যাস

ফাহমিদা বেগম মাঝে মাঝে অবাক হয়ে দেখেন, তার তিন বছরের ছেলে এখন কার্টুনের সংলাপ মুখস্থ বলে ফেলতে পারে। কিন্তু পাশের বাসার খালার নাম মনে থাকে না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রথম কথা হয় তার “মোবাইল দাও।” না দিলে কান্না, জিনিসপত্র ছোড়া, মাটিতে গড়াগড়ি। একসময় ফাহমিদা ভাবতেন, “সব বাচ্চাই তো কার্টুন দেখে।” কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পারেন, বিষয়টা শুধু কার্টুন দেখা না, ধীরে ধীরে শিশুর অন্য সব আনন্দ কমে যাচ্ছে। আজকাল অনেক পরিবারেই এই সমস্যা দেখা যায়। বিশেষ করে ছোট বাসা, নিরাপদ খেলার জায়গার অভাব এবং মা-বাবার কাজের চাপ, সব মিলিয়ে স্ক্রিন অনেক সময় শিশুর সবচেয়ে সহজ সঙ্গী হয়ে যায়।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন টিভি বা কার্টুনই শিশুর আনন্দের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
শিশুর মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, খুব দ্রুতগতির কার্টুন শিশুর মস্তিষ্কে তীব্র উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। দ্রুত দৃশ্য পরিবর্তন, উজ্জ্বল রং এবং একটানা শব্দ মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত উদ্দীপনার সঙ্গে অভ্যস্ত করে ফেলে। ফলে বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক কাজ, যেমন বই দেখা, ছবি আঁকা বা শান্তভাবে খেলা শিশুর কাছে কম আকর্ষণীয় মনে হতে শুরু করতে পারে।
ফাহমিদার ছোট ছেলেটার ক্ষেত্রেও এমন হচ্ছিল। আগে সে বাসার বাইরে বল খেলত, মাটিতে পানি নিয়ে খেলত। এখন শুধু মোবাইল চায়।
তবে সবচেয়ে বড় ভুল যেটা অনেক পরিবার করে হঠাৎ পুরোপুরি মোবাইল বা কার্টুন বন্ধ করে দেওয়া। এতে অনেক সময় শিশুর আচরণ আরও আক্রমণাত্মক বা অস্থির হয়ে যেতে পারে। কারণ সে হঠাৎ করেই পরিচিত আনন্দের উৎস হারিয়ে ফেলে। তাই বিশেষজ্ঞরা ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দেন।
ফাহমিদা এখন সরাসরি “মোবাইল বন্ধ” বলেন না। বরং আগে থেকেই বলে দেন—
“আর ১০ মিনিট পরে কার্টুন বন্ধ হবে।”
এতে শিশুর মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ হয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, আগে থেকে জানিয়ে দিলে ছোট শিশুদের অতিরিক্ত কান্নাকাটি বা রাগের প্রকাশ কিছুটা কমতে পারে।
আরেকটা পরিবর্তন তিনি করেন, একটি ভিডিও শেষ হলে পরেরটি যেন নিজে থেকে চালু না হয়, সেই ব্যবস্থা করেন। আগে একটা কার্টুন শেষ হলে আরেকটা নিজে থেকেই চলত। এতে শিশুর বিরতি নেওয়ার সুযোগ থাকত না। এখন ভিডিও শেষ হলে কিছুক্ষণ থামানো হয়।
এই ছোট পরিবর্তনও স্ক্রিননির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ফাহমিদা আরও একটা জিনিস বুঝেছিলেন, শিশুকে শুধু মোবাইল থেকে সরালেই হবে না, তার মনোযোগ অন্যদিকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার সুযোগও তৈরি করতে হবে। তাই এখন বিকেলে বাসার সামনে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে পাঠানোর চেষ্টা করেন। কখনো বড় মেয়েরা ছোট ভাইকে নিয়ে দোকানদার-ক্রেতার খেলা খেলে, কখনো বালতি ভর্তি পানি দিয়ে মাছ ধরার খেলা বানায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিজের মতো করে বানানো খেলাধুলা শিশুর কল্পনাশক্তি এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এই ধরনের খেলায় শিশু সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়, যা শুধু বসে বসে কার্টুন দেখার তুলনায় অনেক বেশি উপকারী।
আরেকটা বড় সমস্যা হলো, অনেক শিশু মোবাইল ছাড়া খেতেই চায় না।
ফাহমিদার ছেলেরও সেই অভ্যাস ছিল। কার্টুন ছাড়া মুখে ভাত যেত না। পরে তিনি একবারে বন্ধ না করে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনেন। প্রথমে কার্টুনের শব্দ কমান, পরে মোবাইল ছাড়াই গল্প বলতে বলতে খাওয়ানো শুরু করেন।
শুরুতে সময় বেশি লাগলেও কয়েক সপ্তাহ পরে শিশুটি ধীরে ধীরে মানিয়ে নেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, দীর্ঘদিন পর্দা দেখে খাওয়ার অভ্যাস থাকলে শিশু নিজের ক্ষুধা ও পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি ঠিকমতো বুঝতে শেখে না। বরং অন্য কিছুর দিকে মনোযোগ রেখে খেতে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
তবে একটা বিষয়ও মনে রাখা জরুরি, কার্টুন সবসময় খারাপ নয়।
বয়স উপযোগী, শান্ত এবং শিক্ষামূলক বিষয়বস্তু সীমিত সময়ের জন্য উপকারীও হতে পারে। সমস্যা হয় তখন, যখন স্ক্রিনই শিশুর মন খারাপ, বিরক্তি বা কান্না সামলানোর একমাত্র উপায় হয়ে যায়। অর্থাৎ কান্না করলে মোবাইল, খেতে না চাইলে মোবাইল, দুষ্টুমি করলে মোবাইল, তখন শিশুর মনে ধীরে ধীরে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে অস্বস্তি লাগলেই মোবাইল দরকার।
ফাহমিদা এখনও নিখুঁত নন। ক্লান্ত দিনের শেষে তিনি মাঝেমধ্যে কার্টুন চালিয়ে দেন। কিন্তু আগের মতো সারাদিন নয়। কারণ তিনি বুঝেছেন, শিশুর শুধু বিনোদন নয়, মানুষের সঙ্গও প্রয়োজন। একটা শিশুর শৈশব শুধু স্ক্রিনের আলোয় নয়, মানুষের সঙ্গ, দৌড়ঝাঁপ, মাটির গন্ধ আর বাস্তব হাসির মধ্যেও বড় হয়ে ওঠে।
 

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000