লোগো

কর্মজীবী মায়ের ক্লান্তি শিশুর মানসিকতায় কী প্রভাব ফেলে?

কর্মজীবী মায়ের ক্লান্তি শিশুর মানসিকতায় কী প্রভাব ফেলে?

ফাহমিদা বেগম প্রতিদিন প্রায় ১০ ঘণ্টা গার্মেন্টসে কাজ করেন। বাসায় ফিরতে ফিরতে শরীর এতটাই ক্লান্ত হয়ে যায় যে অনেক দিন ছোট ছেলেটা কোলে উঠতে চাইলে তিনি বিরক্ত হয়ে বলেন, “একটু শান্তিতে থাকতে দাও তো!” কথাটা বলার পরেই তার খারাপ লাগে। কিন্তু তখন শরীর আর মাথা দুইটাই যেন কাজ করা বন্ধ করে দেয়।

অনেক কর্মজীবী মায়ের জীবনেই এই দৃশ্য খুব পরিচিত। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারে, যেখানে অফিস শেষে বাসার কাজ, রান্না, সন্তান সামলানো সবকিছুর দায়িত্ব প্রায় একাই বহন করতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মায়ের এই দীর্ঘদিনের মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি কি শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে?
বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী বলা হয় শুধু আচরণে না, শিশুর মানসিক বিকাশ এর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
শিশুরা জন্ম থেকেই তাদের সবচেয়ে কাছের মানুষের মানসিক অবস্থা খুব সংবেদনশীলভাবে অনুভব করতে পারে। বিশেষ করে মা যদি নিয়মিত ক্লান্ত, বিরক্ত, মানসিকভাবে অনুপস্থিত বা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকেন, তাহলে অনেক সময় শিশুর স্নায়ুতন্ত্রও সবসময় এক ধরনের চাপের অবস্থায় থাকতে শুরু করে। 
ফাহমিদার ৬ বছরের মেয়েটা কিছুদিন ধরে খুব ছোট ছোট বিষয়েও ভয় পেতে শুরু করেছিল। মা বাসায় ফিরতে দেরি হলেই সে বারবার দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতো। আবার ছোট ছেলেটা মাকে বাসায় পেয়েও অনেক সময় অস্থির আচরণ করতো যেমন কোলে উঠতে চাইতো, আবার হঠাৎ রেগে যেত।
শিশুমনোবিজ্ঞানের মতে, এটি অনেক সময় ‘সম্পর্কের খোঁজে আচরণ’ হতে পারে। অর্থাৎ শিশু বুঝতে পারে মা কাছে আছেন, কিন্তু মানসিকভাবে খুব ক্লান্ত। তখন সে আরও বেশি মনোযোগ চাইতে শুরু করে।
এখানেই অনেক মা ভুল বুঝেন,
“আমি এত কষ্ট করি, তারপরও বাচ্চা এত জেদ করে কেন?’
আসলে অনেক সময় শিশু জেদ করছে না, সে ভরসা আর আশ্বাস খুঁজছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘Emotional Contagion’। এটি এমন একটি মানসিক প্রক্রিয়া, যেখানে পরিবারের একজনের আবেগ ও মানসিক অবস্থা ধীরে ধীরে অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে। তাই বাসায় যদি দীর্ঘদিন ক্লান্তি, রাগ, চিৎকার বা বিরক্তির পরিবেশ থাকে, তাহলে তার প্রভাব শিশুর মন ও আচরণেও দেখা যেতে পারে।
ফাহমিদা খেয়াল করেছিলেন, যেদিন তিনি খুব ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরেন এবং বাচ্চাদের সাথে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন, সেদিন বাসার পরিবেশও বেশি অস্থির হয়ে যায়। বড় মেয়ে চুপচাপ থাকে, ছোটরা বেশি ঝগড়া করে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সবসময় নিখুঁত হওয়া নয় বরং ভুলের পর সম্পর্ক ঠিক করে নেওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবা মাঝে মাঝে রেগে যেতে পারেন, ক্লান্ত হতে পারেন। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু পরে যদি শিশুর সাথে Reconnect করা যায়, তাহলে সম্পর্ক আবার নিরাপদ অনুভূত হতে শুরু করে।
যেমন, ফাহমিদা এখন চেষ্টা করেন রেগে গেলে কিছুক্ষণ পরে সন্তানের কাছে গিয়ে বলেন,
“আম্মু খুব ক্লান্ত ছিল, তাই রাগ হয়ে গেছে।”
এই Simple Emotional Repair শিশুর জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এতে শিশু শেখে সম্পর্কের মধ্যে সমস্যা হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা শেষ হয়ে যায় না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মজীবি মায়েদের Guilt। অনেক মা মনে করেন, “আমি বাচ্চাকে যথেষ্ট সময় দিতে পারছি না।” কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সময় নয়, বরংশিশুর আবেগের প্রতি সাড়া দিয়ে তার সাথে যোগাযোগ করা।
মানে, সারাদিন একসাথে থাকলেই যে শিশু নিজেকে Connected অনুভব করবে, এটা সবসময় ঠিক না।
বরং মাত্র ২০ মিনিট মন দিয়ে কথা বলা, জড়িয়ে ধরা, তার গল্পটা মনোযোগ দিয়ে শোনা, এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই অনেক সময় শিশুর কাছে বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে, সারাদিন পাশে থেকেও যদি সেই আবেগের সংযোগ না থাকে তার চেয়ে।
ফাহমিদা এখন বাসায় ফিরে অন্তত কিছু সময় শুধু বাচ্চাদের জন্য রাখেন। মোবাইল দূরে রেখে তাদের দিনের গল্প শোনেন। এতে বাচ্চারাও ধীরে ধীরে শান্ত থাকে।
তবে একটা বিষয় সমাজেরও বোঝা দরকার কর্মজীবী মায়ের ক্লান্তি শুধু কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়। অনেক সময় এটা সাপোর্ট সিস্টেমের অভাব, আর্থিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি আর দীর্ঘদিনের মানসিক ক্লান্তির ফল। তাই একজন মাকে শুধু ‘আরও ধৈর্য ধরো’ বললেই সমস্যার সমাধান হয় না। তারও প্রয়োজন বিশ্রাম, মানসিক সমর্থন আর নিজের জন্য কিছুটা সময়।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000