
আমার ছেলে যখন প্রায় দুই বছরের কাছাকাছি, তখন একটা জিনিস খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে পারতাম, ও সবকিছু নিয়েই কৌতূহলী। রান্নাঘরের চামচ, কাপড়ের ক্লিপ, পুরোনো বাক্স, সবকিছুই ওর কাছে খেলনা মনে হতো। তখন থেকেই ভাবতাম, বাসায় যদি ছোট্ট একটা লার্নিং কর্নার (শেখার কোণ) তৈরি করা যেত! কিন্তু সত্যি বলতে, আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারে “লার্নিং সেটআপ” শুনলেই অনেক সময় মনে হয় অনেক টাকা লাগবে। বড় বইয়ের তাক, দামি খেলনা, দামি টেবিল, এগুলো না থাকলে বুঝি সম্ভব না।
পরে বুঝলাম, ছোট শিশুর শেখার জন্য সবচেয়ে জরুরি জিনিস দামি সেটআপ না, বরং নিরাপদ, গোছানো আর ইন্টারঅ্যাকটিভ একটা পরিবেশ।
বিশেষ করে ০–৫ বছর বয়সে শিশুর মস্তিষ্ক খুব দ্রুত বিকাশ লাভ করে। এই সময় তারা খেলাধুলার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি শেখে। অর্থাৎ খেলতে খেলতেই তারা ভাষা, সমস্যা সমাধান, হাতের দক্ষতা, কল্পনাশক্তি, সবকিছু তৈরি করে।
তাই আমি বাসার এক কোণ খুব ছোটভাবে সাজানো শুরু করি।
প্রথমে একটা বিষয় মাথায় রাখি, লার্নিং কর্নার মানে মিনি ক্লাসরুম না। এটা এমন একটা জায়গা, যেখানে শিশু স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের মতো করে অনুসন্ধান করতে পারে।
আমাদের বাসা ছোট। তাই ড্রয়িং রুমের এক পাশে একটা মাদুর বিছিয়ে শুরু করি। দেয়ালের পাশে একটা ছোট প্লাস্টিকের র্যাক রাখি। সেখানে ছেলের কিছু বই, রঙ করার পেন্সিল, ব্লকস আর কয়েকটা শিক্ষামূলক খেলনা রাখি।
খেয়াল করে দেখেছি, সব খেলনা একসাথে ছড়িয়ে দিলে শিশুরা অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে যায়। তাই এখন আমি একসাথে কম জিনিস রাখি, পরে পালা করে পরিবর্তন করি। শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞরাও এটি সাজেস্ট করেন। কম কিন্তু লক্ষ্যভিত্তিক খেলনা শিশুর মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।
আরেকটা জিনিস আমি ইচ্ছাকৃতভাবে করেছি, সবকিছু যেন শিশুর উচ্চতা অনুযায়ী সহজে নেওয়া যায়। কারণ ছোট শিশুরা স্বাধীনতা অনুভব করতে ভালোবাসে। যখন ও নিজে বই নিতে পারে বা খেলনা গুছাতে পারে, তখন তার আত্মবিশ্বাসও বাড়ে।
আমরা অনেক সময় ভাবি শেখা মানেই শুধু অক্ষর বা সংখ্যা শেখানো। কিন্তু এই বয়সে সেন্সরি প্লে (ইন্দ্রিয়ভিত্তিক খেলা) আর দৈনন্দিন কাজও বড় ধরনের শেখা।
যেমন আমি বাসার জিনিস দিয়েই কিছু কাজ করাই—
• ডাল আলাদা করা
• রঙ চেনানো
• প্লাস্টিক কাপ সাজানো
• কাপড়ের ক্লিপ লাগানো
• পুরোনো ম্যাগাজিন দেখে ছবি চেনানো
এসব কাজ হাতের দক্ষতা (ফাইন মোটর স্কিল) এবং মনোযোগ বাড়াতে বৈজ্ঞানিকভাবে সাহায্য করে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্ক্রিনবিহীন সময় কাটানো। আগে আমি অনেক সময় রান্নার সময় মোবাইল দিয়ে রাখতাম। এখন চেষ্টা করি লার্নিং কর্নারে কিছু স্বাধীনভাবে করার মতো কাজ রাখতে, যেমন রঙ করা বই বা সফট ব্লকস। এতে স্ক্রিনের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমে।
তবে একটা ভুল আমি শুরুতে করেছিলাম, কর্নারটা খুব বেশি সাজিয়ে ফেলেছিলাম। অনেক পোস্টার, অনেক রং, অনেক খেলনা। পরে দেখলাম, ছেলে সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে।
এখন আমি চেষ্টা করি পরিবেশটা শিশুবান্ধব হলেও শান্ত রাখতে। কারণ অতিরিক্ত দৃশ্যগত উদ্দীপনা ছোট শিশুদের মনোযোগ কমিয়ে দিতে পারে।
আমি আরেকটা জিনিস অনুসরণ করি, শুধু “স্টাডি কর্নার” না, বরং “ইন্টারঅ্যাকশন কর্নার” বানানোর চেষ্টা করি।
মানে আমি নিজেও মাঝে মাঝে ওর পাশে বসি। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিক্রিয়াশীল মিথস্ক্রিয়া (responsive interaction) শিশুর ভাষা বিকাশ এবং আবেগীয় বন্ধন, দুটোর জন্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আমার স্বামীও এখন মাঝে মাঝে রাতে বই দেখে ছেলেকে ছবি চেনায়। এতে ওর আগ্রহ অনেক বেড়ে গেছে।
লার্নিং কর্নার বানাতে যে জিনিসগুলো সবচেয়ে কাজে এসেছে—
• পুরোনো কার্টন বক্স
• কম দামের প্লাস্টিকের ঝুড়ি
• সেকেন্ড হ্যান্ড বই
• প্রিন্ট করা ফ্ল্যাশকার্ড
• মেঝের মাদুর
• ধোয়া যায় এমন রঙ পেন্সিল
অর্থাৎ দামি না হলেও সৃজনশীল হওয়া যায়।
তবে একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, শিশুর লার্নিং কর্নার যেন চাপের জায়গা না হয়।
অনেক বাবা-মা ছোট বয়স থেকেই অতিরিক্ত একাডেমিক পরিবেশ তৈরি করেন। কিন্তু ০–৫ বছর বয়সে সবচেয়ে কার্যকর শেখা হয় খেলাধুলা, গল্প, মেলামেশা এবং অনুসন্ধানের মাধ্যমে।
এখনও আমার বাসার কর্নার একদম পারফেক্ট না। অনেক সময় খেলনা ছড়িয়ে থাকে, রঙের পেন্সিল হারিয়ে যায়। কিন্তু একটা জিনিস আমি বুঝেছি, শিশুর শেখার জন্য সবচেয়ে জরুরি জিনিস দামি সেটআপ না, বরং এমন একটা পরিবেশ যেখানে সে নিরাপদ বোধ করে, কৌতূহলী হতে পারে এবং নিজের মতো করে অনুসন্ধান করতে পারে।
ছোট একটা কোণও শিশুর বড় শেখার জায়গা হয়ে উঠতে পারে, যদি সেখানে একটু সময়, একটু মনোযোগ আর একটু সৃজনশীলতা যোগ করা যায়।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন