লোগো

স্কুলে শান্ত, বাসায় রাগী: শিশুর আচরণ এত আলাদা কেন হয়?

স্কুলে শান্ত, বাসায় রাগী: শিশুর আচরণ এত আলাদা কেন হয়?

প্রশ্নঃ আমি একজন বাবা। আমার মেয়ের বয়স ৬ বছর, ওর ছোট একটা ভাই আছে। স্কুলে সবাই বলে ও খুব ভদ্র আর শান্ত। কিন্তু বাসায় ফিরেই ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে, রেগে যায়, অনেক সময় খেলনাও ছুড়ে ফেলে। স্কুল আর বাসার আচরণ এত আলাদা কেন হতে পারে?

বর্তমানে অনেক বাবা-মা-ই অবাক হয়ে দেখেন যে শিশু স্কুলে খুব ভদ্র, শান্ত ও নিয়ম মেনে চলে; কিন্তু বাসায় ফিরেই রেগে যায়, ভাইবোনের সঙ্গে ঝগড়া করে বা খেলনা ছুড়ে ফেলে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, “স্কুলে পারলে বাসায় পারে না কেন?” কিন্তু শিশুর আচরণ সব জায়গায় একই রকম হবে, এটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
৬ বছর বয়সী একটি শিশু স্কুলে সারাদিন অনেক কিছু সামলায়। শিক্ষক কী বলছেন শুনতে হয়, নিয়ম মানতে হয়, বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে হয়, নিজের ইচ্ছা অনেক সময় আটকে রাখতে হয়। বাইরে সে হয়তো খুব চেষ্টা করে নিজেকে “ভালো” রাখছে। কিন্তু বাসায় ফেরার পর সে নিরাপদ জায়গা পায়, যেখানে সে নিজের জমে থাকা ক্লান্তি, বিরক্তি বা চাপ বের করে দিতে পারে। তাই বাসার আচরণ খারাপ মানেই শিশুটি খারাপ হয়ে যাচ্ছে, এমন নয়। অনেক সময় এর পেছনে থাকে দিনের শেষে মানসিক ক্লান্তি।
আরেকটি বড় কারণ হতে পারে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে মনোযোগ ভাগাভাগি। স্কুলে সে আলাদা একজন মানুষ হিসেবে থাকে। কিন্তু বাসায় ফিরে দেখে মা-বাবার মনোযোগ ছোট ভাইয়ের দিকেও যাচ্ছে। ছোট ভাই তার খেলনা ধরছে, তার জায়গায় আসছে, মা-বাবার সময় নিচ্ছে, এসব থেকে তার ভেতরে রাগ বা ঈর্ষা তৈরি হতে পারে। সে হয়তো বলতে পারে না, “আমারও তোমাদের দরকার।” তাই সেটা ঝগড়া, চিৎকার বা খেলনা ছোড়ার মাধ্যমে প্রকাশ করছে।
এই অবস্থায় প্রথমে শিশুকে লেবেল দেওয়া যাবে না। “তুমি এত খারাপ কেন?”, “স্কুলে তো ভালো থাকো, বাসায় নাটক করো কেন?”, এ ধরনের কথা শিশুর ভেতরে লজ্জা ও রাগ বাড়াতে পারে। বরং বলা যায়, “স্কুল থেকে ফিরে তুমি অনেক ক্লান্ত থাকো মনে হচ্ছে” অথবা “ভাই তোমার খেলনা ধরলে তোমার রাগ হয়, তাই না?” এতে শিশু বুঝতে শেখে, তার অনুভূতিকে মা-বাবা গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তবে অনুভূতি বোঝা মানে খারাপ আচরণ মেনে নেওয়া নয়। খেলনা ছুড়ে ফেললে শান্ত কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলতে হবে, “রাগ হওয়া ঠিক আছে, কিন্তু খেলনা ছোড়া ঠিক নয়। এতে কেউ ব্যথা পেতে পারে।” তারপর খেলনাটি কিছু সময়ের জন্য সরিয়ে রাখা যায়। নিয়মটি যেন শাস্তির মতো না হয়ে নিরাপত্তার নিয়মের মতো হয়।
স্কুল থেকে ফেরার পর সরাসরি পড়া, প্রশ্ন বা বকাঝকা শুরু না করে ২০–৩০ মিনিট বিশ্রামের সময় দিলে ভালো হয়। পানি খাওয়া, হালকা নাশতা, কাপড় বদলানো, একটু চুপচাপ থাকা বা মায়ের-বাবার পাশে বসা, এসব শিশুকে শান্ত হতে সাহায্য করে। অনেক সময় ক্ষুধা আর ক্লান্তিও রাগ বাড়িয়ে দেয়।
প্রতিদিন বড় মেয়ের জন্য আলাদা ১০–১৫ মিনিট সময় রাখা খুব জরুরি। এই সময়টায় ছোট ভাই থাকবে না, মোবাইল থাকবে না, শুধু বাবা বা মা আর মেয়ে থাকবে। গল্প, আঁকা, ব্লক খেলা বা স্কুলের কথা ইত্যাদি যেকোনো কিছু হতে পারে। এতে সে বুঝবে, “আমি এখনো গুরুত্বপূর্ণ।”
ছোট ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে জোর করে “ভালো বোন হও” বলা ঠিক নয়। বরং ছোট ছোট সহযোগিতার সুযোগ দিন। যেমন, “তুমি কি ভাইকে একটা বল গড়িয়ে দেবে?” বা “চলো, আমরা দুজন মিলে ভাইকে একটা গান শুনাই।” ভালো আচরণ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে প্রশংসা করুন।
শিশুর আচরণ যদি খুব বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে যায়, বারবার কাউকে আঘাত করে, ঘুম-খাওয়া কমে যায়, বা দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশু মনোবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
মূল কথা হলো, স্কুলে শান্ত আর বাসায় রাগী, এটা অনেক সময় শিশুর নিরাপদ জায়গায় আবেগ প্রকাশের লক্ষণ। ধৈর্য, স্পষ্ট সীমা আর আলাদা ভালোবাসার সময় দিলে শিশুটি ধীরে ধীরে নিজের রাগ সামলাতে শিখবে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লিখুন

0/1000
মন্তব্য লোড হচ্ছে...