
ফাহমিদা বেগমের তিন সন্তানই খেলতে খুব ভালোবাসে। কিন্তু সবসময় খেলনা কিনে দেওয়ার মতো সামর্থ্য তাদের নেই। মাস শেষে বাসাভাড়া, বাজার আর স্কুলের খরচ মেটাতেই অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়। তাই ঈদ ছাড়া নতুন খেলনা খুব একটা আসে না বাসায়। তবু ফাহমিদা একটা বিষয় খেয়াল করেছেন, বাচ্চারা আসলে সবসময় দামি খেলনা খোঁজে না, তারা খোঁজে আনন্দ আর সঙ্গ। এক বিকেলে গলির সামনে দেখা গেল, তার ছোট ছেলেটা একটা পুরোনো রিকশার টায়ার লাঠি দিয়ে ঠেলে দৌড়াচ্ছে। পাশে আরও কয়েকজন শিশু। হাসতে হাসতে সবার অবস্থা শেষ। অথচ সেখানে কোনো ব্যাটারিচালিত গাড়ি বা দামি খেলনা ছিল না।
আজকাল অনেক মা-বাবার মনে একটা চাপ কাজ করে, “বাচ্চাকে ভালো বিনোদন দিতে হলে অনেক টাকা লাগবে।”
কিন্তু শিশু বিকাশবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণার তথ্যমতে, শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সক্রিয় খেলাধুলা, কল্পনাশক্তির ব্যবহার এবং অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা; দামি খেলনা নয়। বরং আগে থেকেই তৈরি করা অনেক খেলনা শিশুদের কল্পনাশক্তি কম ব্যবহার করতে শেখায়। অন্যদিকে যেসব খেলায় শিশু নিজের মতো করে কিছু বানায় বা খেলার নিয়ম তৈরি করে, সেগুলো সৃজনশীলতা বাড়াতে বেশি সাহায্য করে।
ফাহমিদার ছোটবেলার অনেক খেলাই এখন তার মেয়েরা শিখছে।
যেমন,
• সুপারি গাছের খোল দিয়ে গাড়ি বানানো
• পুরোনো রিকশার টায়ার গড়িয়ে দৌড়ানো
• মাঠে খেলা
• কাগজের নৌকা বানানো
• বোতলের ঢাকনা দিয়ে গোনার খেলা
• মাটিতে দাগ কেটে লাফানোর খেলা
• পুরোনো কাপড় দিয়ে পুতুল বানানো
এই খেলাগুলো শুধু আনন্দের জন্য নয়, শিশুর শারীরিক সমন্বয়, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং সামাজিক দক্ষতা গড়ে তুলতেও সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, মুক্তভাবে দৌড়ঝাঁপ করে খেলা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। দৌড়ানো, লাফানো, ভারসাম্য বজায় রাখা, এসব কাজ শরীরের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা ও ইন্দ্রিয়ের বিকাশে সাহায্য করে।
এখনকার অনেক শিশু সারাদিন ঘরের মধ্যে মোবাইল নিয়ে বসে থাকে। কারণ বাইরে খেলতে গেলে “ভালো খেলনা নেই” এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে শিশুদের সবচেয়ে বেশি দরকার নড়াচড়া আর মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ।
ফাহমিদার ৯ বছরের মেয়েটা একদিন ছোট ভাইকে নিয়ে পুরোনো কার্টন দিয়ে ঘর বানানোর খেলা খেলছিল। সেখানে কখনো রান্নাঘর, কখনো স্কুল, কখনো দোকান বানানো হচ্ছিল। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ খেলা মনে হলেও, আসলে সেখানে কল্পনা, যোগাযোগ আর বিভিন্ন চরিত্রের ভূমিকা পালন সবই হচ্ছিল।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, অভিনয়ধর্মী খেলা শিশুর আবেগ বোঝার ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এতে শিশু অন্যের অনুভূতি বুঝতে শেখে, ভাষার দক্ষতা বাড়ে, এমনকি ভবিষ্যতে সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাও উন্নত হতে পারে।
আরেক ধরনের আনন্দও আছে, যেটা অনেক নিম্নআয়ের পরিবারে এখনও দেখা যায় “ছোট ছোট পারিবারিক ভ্রমণ” । বড় কোনো রেস্তোরাঁ নয়, বরং কাছের মাঠ, নদীর পাড় বা খোলা জায়গায় সবাই মিলে রান্না করে খাওয়া।
মাঝে মাঝে ফাহমিদার পরিবারও এমন করে। বাসা থেকে চাল, ডাল, আলু আর ডিম নিয়ে গিয়ে খোলা জায়গায় চুলা বানিয়ে রান্না হয়। বাচ্চারা আশেপাশে দৌড়াদৌড়ি করে, শুকনো কাঠ কুড়িয়ে আনে, পানি আনে। তারপর সবাই মিলে পিকনিকের মতো বসে খায়। শিশুদের কাছে এই অভিজ্ঞতাগুলো অনেক স্মরণীয় হয়ে থাকে। কারণ এখানে শুধু খাওয়া নয়, একসঙ্গে সময় কাটানো, সহযোগিতা করা এবং আনন্দ ভাগাভাগি করার সুযোগ তৈরি হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটানো শিশুদের মানসিক নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে। এমনকি খোলা পরিবেশে সময় কাটানো শিশুদের মানসিক চাপ কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, বিনোদন মানেই সবসময় শিশুকে ব্যস্ত রাখা নয়।
অনেক পরিবারে ক্লান্তি বা সময়ের অভাবে শিশুর হাতে শুধু মোবাইল ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে কিছুক্ষণ শান্ত থাকলেও, দীর্ঘ সময় স্ক্রিন নির্ভর বিনোদন শিশুর মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা ও ঘুমের অভ্যাসের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই ফাহমিদা এখন একটা ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেন। পুরোপুরি মোবাইল বন্ধ করতে পারেন না, কিন্তু সময় কমিয়ে বাস্তব খেলাধুলায় উৎসাহ দেন।
কখনো ছাদে নিয়ে আকাশ দেখান, কখনো রাস্তায় চক দিয়ে আঁকতে দেন, কখনো সবাই মিলে “কে বেশি শব্দ চিনতে পারে” খেলা খেলেন।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুরা অনেক সময় খেলনার চেয়ে একসঙ্গে কাটানো সময় বেশি মনে রাখে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারের সঙ্গে খেলা বা সময় কাটানো শিশুদের মানসিক নিরাপত্তাবোধ বাড়াতে সাহায্য করে। সেটা দামি কোনো আয়োজন না হলেও হয়। একসঙ্গে গল্প করা, লুডু খেলা, পুরোনো গান গাওয়া, এসবও শিশুর মনে সুন্দর স্মৃতি তৈরি করতে পারে।
ফাহমিদার সংসারে হয়তো বড় বিনোদনকেন্দ্র বা দামি শিশু পার্কে যাওয়ার সুযোগ খুব কম। কিন্তু ঈদের পরে একদিন সবাই মিলে মাঠে গিয়ে ঘুড়ি উড়ানো, বৃষ্টির পরে কাগজের নৌকা ভাসানো কিংবা খোলা আকাশের নিচে একসঙ্গে রান্না করে খাওয়া, এগুলোই তাদের বাচ্চাদের কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দ। কারণ শিশুর কাছে বিনোদনের আসল মূল্য অনেক সময় টাকায় নয়, অনুভূতিতে মাপা হয়। আর একটু সময়, একটু সঙ্গ আর একটু কল্পনা থাকলে সাধ্যের মধ্যেও শিশুর শৈশব সুন্দর হতে পারে।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন