
আমার মেয়ের বয়স এখন তিন মাস। এত ছোট একটা বাচ্চাকে দেখে অনেকেই মজা করে বলে, “এখন থেকেই আবার কী শেখাবে?” কিন্তু মজার বিষয় হলো, আমি আর আমার স্বামী এখন থেকেই ওকে বই পড়ে শোনাই। অনেকের কাছে এটা অদ্ভুত লাগতে পারে। কারণ আমাদের দেশে এখনও অনেকেই মনে করেন, পড়াশোনা মানেই খাতা-কলম, অ আ ক খ বা ABC শেখানো। কিন্তু শিশুদের শেখা আসলে এর অনেক আগেই শুরু হয়।
বিজ্ঞান অনুযায়ী, শিশুর মস্তিষ্ক জন্মের পরের প্রথম কয়েক বছরে খুব দ্রুত বিকাশ লাভ করে। বিশেষ করে ০–৫ বছর বয়সকে আর্লি ব্রেইন ডেভেলপমেন্ট (Early Brain Development) এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ধরা হয়। এই সময় শিশুরা শুধু “পড়াশোনা” না, আশেপাশের শব্দ, মুখভঙ্গি, কথা, স্পর্শ সবকিছু থেকেই শিখতে থাকে।
আমার ছেলে যখন এক বছরের ছিল, তখন আমি শুধু ছবি দেখিয়ে জিনিসের নাম বলতাম—
“এটা গাছ।”
“এটা বিড়াল।”
“এটা লাল রং।”
তখন মনে হতো ও হয়তো কিছুই বুঝছে না। কিন্তু পরে খেয়াল করলাম, ধীরে ধীরে ও শব্দগুলো চিনতে শুরু করেছে।
আর ছোট মেয়ের ক্ষেত্রে আমরা এখন থেকেই বই পড়ে শোনাই। তিন মাস বয়সী শিশু গল্প বুঝবে না, এটা সত্যি। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট বয়স থেকেই শিশুর সঙ্গে কথা বলা, গান গাওয়া বা বই পড়ে শোনানো ভাষা বিকাশের জন্য খুব উপকারী।
শিশুরা প্রথমে শব্দের অর্থ না, বরং শব্দের ছন্দ আর কণ্ঠের ওঠানামা (voice tone) গ্রহণ করে। এতে তাদের মস্তিষ্ক ভাষার ধরণ চিনতে শেখে। American Academy of Pediatrics-ও ছোট বয়স থেকেই পড়া ও কথা বলার অভ্যাসকে উৎসাহিত করে।
আমরা রাতে ঘুমানোর আগে ছোট কাপড়ের বই বা বড় ছবির বই খুলে বসি। কখনো শুধু ছবির দিকে আঙুল দেখিয়ে কথা বলি। অনেক সময় মেয়ে শুধু তাকিয়ে থাকে কিন্তু সেটাও শেখারই একটি অংশ।
আমার মনে হয়, আমাদের সমাজে একটা চাপ খুব বেশি, “বাচ্চা কবে পড়া শুরু করবে?”
দুই বছর হলেই কেউ বলে কোচিং, কেউ বলে হাতের লেখা, কেউ আবার নার্সারি নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি করে। আগে আমিও এসব নিয়ে টেনশন করতাম।
কিন্তু পরে বুঝেছি, খুব ছোট বয়সে অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ অনেক সময় উল্টো মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে ০–৫ বছর বয়সে খেলাধুলাভিত্তিক শেখা সবচেয়ে কার্যকর। অর্থাৎ খেলা, গল্প, মেলামেশা, কল্পনাভিত্তিক খেলা, এসবের মাধ্যমেই শিশুর মস্তিষ্ক সবচেয়ে ভালো শেখে।
আমার ছেলে এখন তিন বছর বয়সে ব্লক দিয়ে টাওয়ার বানায়, ছবি দেখে গল্প বানায়, রং মিলায়। বাইরে থেকে এগুলো শুধু খেলা মনে হলেও, এর মধ্য দিয়েই তার সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, ভাষা এবং সৃজনশীলতা গড়ে উঠছে।
আরেকটা জিনিস আমি বুঝেছি, প্রতিটি শিশুর শেখার গতি আলাদা।
কেউ তিন বছরেই অক্ষর চিনে ফেলে, কেউ একটু পরে। তাই অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা করা ঠিক না। কারণ শিশুর বিকাশ সবার ক্ষেত্রে একরকমভাবে এগোয় না।
আমি এখন একটা ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করি,
শেখাবো, কিন্তু চাপ দিয়ে না।
দিক নির্দেশনা দেবো, কিন্তু ভয় দেখিয়ে না।
আমার স্বামীও এখন বাসায় ফিরে ছেলের সঙ্গে বই দেখে। অনেক সময় শুধু ছবি দেখার বই নিয়ে বসে থাকে। এতে শুধু শেখা না, সম্পর্কও গভীর হয়।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর প্রথম শিক্ষক আসলে পরিবার।
দামি স্কুল বা কোচিংয়ের আগেও শিশু বাসা থেকেই যোগাযোগ, আবেগ, কৌতূহল এসব শিখতে শুরু করে। তাই early learning-এর সবচেয়ে বড় অংশ হলো রেসপনসিভ প্যারেন্টিং (Responsive Parenting)।
তবে একটা বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি, যদি কোনো শিশু বয়স অনুযায়ী শব্দে সাড়া না দেয়, চোখে চোখ কম রাখে, বা ভাষা বিকাশে উল্লেখযোগ্য দেরি দেখা যায়, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করা ভালো। কারণ early support অনেক সময় খুব কার্যকর হতে পারে।
আমি এখন মনে করি, শিশুর শেখা শুরু করার কোনো নির্দিষ্ট “ঠিক বয়স” নেই।
জন্মের পর থেকেই শেখা শুরু হয়,যেমন যখন মা কথা বলে, বাবা বই পড়ে শোনায়, কেউ হাসে, গান গায়, ছবি দেখায় সবই শেখার অংশ।
তাই ছোট শিশুর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় “আগে পড়া শুরু করা” না, বরং শেখাকে আনন্দময় করে তোলা।
কারণ যে শিশু শেখাকে ভালোবাসতে শেখে, তার পুরো শেখার যাত্রাটাই সুন্দর হয়ে ওঠে।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন